lulupedia

প্রাগ

5573 words·২১/৯/২০২৬·বাংলা
6

প্রাগ (চেক: Praha; ইংরেজি: Prague) হলো মধ্য ইউরোপের রাষ্ট্র চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ভলতাভা নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি চেক প্রজাতন্ত্রের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র এবং ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন ও সুন্দর রাজধানী হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষ এবং মহানগর এলাকাসহ প্রায় ২৭ লক্ষ, যা চেক প্রজাতন্ত্রের মোট জনসংখ্যার এক বড় অংশ গঠন করেছে। অসংখ্য গথিক ও বারোক স্থাপত্যের মিনারে আবৃত হওয়ার কারণে প্রাগ "শত মিনারের শহর" ও "সোনার শহর" নামেও পরিচিত। শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্র ১৯৯২ সাল থেকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।

ভূগোল ও জলবায়ু

প্রাগ চেক প্রজাতন্ত্রের পশ্চিম-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে, বোহেমিয়া অঞ্চলের মাঝে ভলতাভা নদীর তীরে অবস্থিত। নদীটি শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শহরটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে এবং নদীর ওপর অসংখ্য ঐতিহাসিক সেতু নির্মিত হয়েছে, যার মধ্যে চার্লস সেতু সবচেয়ে বিখ্যাত। শহরটির আয়তন প্রায় ৪৯৬ বর্গকিলোমিটার। এটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে প্রায় ২০০-৪০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং চারদিকে পাহাড় ও মালভূমি দ্বারা পরিবেষ্টিত।

প্রাগের জলবায়ু সমুদ্রীয় ও আর্দ্র মহাদেশীয় জলবায়ুর মধ্যবর্তী ধরনের। গ্রীষ্মকাল সাধারণত উষ্ণ ও আর্দ্র এবং শীতকাল ঠান্ডা ও মেঘলা থাকে। বার্ষিক গড় তাপমাত্রা প্রায় ৯-১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৫০০-৬০০ মিলিমিটার।

ইতিহাস

প্রাগ অঞ্চলে মানব বসতির প্রমাণ প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই পাওয়া যায়। তবে ঐতিহাসিকভাবে শহরের সূচনা ধরা হয় নবম শতকে, যখন বোহেমিয়ার প্রিমিসলিড রাজবংশ প্রাগ দুর্গ প্রতিষ্ঠা করে। ধীরে ধীরে দুর্গের চারপাশে বসতি গড়ে উঠে এবং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপ নেয়। ত্রয়োদশ শতকে প্রাগ আনুষ্ঠানিকভাবে নগর মর্যাদা লাভ করে এবং পুরনো শহর ও ছোট পাড়াসহ বিভিন্ন জনপদ একত্রিত হয়ে শহরের ভিত্তি গঠিত হয়।

চতুর্দশ শতকে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট চতুর্থ চার্লসের শাসনামলে প্রাগ তার স্বর্ণযুগ অনুভব করে। ১৩৪৮ সালে তিনি মধ্য ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং প্রাগকে পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। এই সময়ে চার্লস সেতু ও সেন্ট ভিটাস ক্যাথেড্রালের নির্মাণকাজ শুরু হয়। পঞ্চদশ শতকে জন হুসের ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন থেকে উদ্ভূত হুসাইট যুদ্ধসমূহে প্রাগ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। ১৪১৯ সালের প্রথম প্রাগ বিক্ষেপ (ডিফেনেস্ট্রেশন) এই যুদ্ধগুলোর সূত্রপাত ঘটায়।

ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকে প্রাগ হাবসবুর্গ রাজবংশের অধীনে আসে এবং ১৫৮৩ সালে সম্রাট দ্বিতীয় রুডলফ এটিকে নিজ রাজধানী বানান। ১৬১৮ সালের দ্বিতীয় প্রাগ বিক্ষেপ ইউরোপীয় ইতিহাসের অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সূচনা করে। হোয়াইট মাউন্টেনের যুদ্ধে পরাজয়ের পর শহরটি হাবসবুর্গ শাসনে ফিরে যায় এবং পরবর্তীকালে বারোক স্থাপত্যের ব্যাপক বিকাশ লাভ করে।

উনবিংশ শতকে শিল্পবিপ্লবের ফলে প্রাগ দ্রুত সম্প্রসারিত হয় এবং চেক জাতীয় জাগরণ আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯১৮ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের পতনের পর প্রাগ সদ্য প্রতিষ্ঠিত চেকোস্লোভাকিয়ার রাজধানী হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি জার্মানির দখল এবং যুদ্ধশেষে সোভিয়েত প্রভাবের অধীনে শহরটির সাম্যবাদী শাসনের অভিজ্ঞতা হয়। ১৯৬৮ সালে "সমাজতন্ত্রের মানবিক মুখ" প্রতিষ্ঠার প্রয়াস হিসেবে পরিচিত প্রাগ বসন্ত আন্দোলন সোভিয়েত বাহিনীর আক্রমণের মুখে স্তব্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৯ সালে রক্তপাতহীন ভেলভেট বিপ্লবের মাধ্যমে সাম্যবাদী শাসনের অবসান ঘটে এবং নাট্যকার ভাৎসলাভ হাভেল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৩ সালে চেকোস্লোভাকিয়া শান্তিপূর্ণভাবে বিভক্ত হলে প্রাগ স্বাধীন চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী হয়।

প্রশাসনিক কাঠামো

প্রাগ চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী হিসেবে বিশেষ প্রশাসনিক মর্যাদা ভোগ করে। শহরটি একইসঙ্গে একটি পৌরসভা, একটি অঞ্চল ও একটি জেলার কার্যক্রম পরিচালনা করে। শহরের প্রশাসনিক প্রধান হলেন নির্বাচিত মেয়র এবং আইন-প্রণয়ন ক্ষমতা প্রাগ সিটি অ্যাসেম্বলির হাতে ন্যস্ত। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য পুরো শহরটি ২২টি প্রশাসনিক জেলায় এবং আরও ছোট ১১২টি ক্যাডাস্ট্রাল এলাকায় বিভক্ত। প্রাগ ১ নম্বর জেলায় শহরের ঐতিহাসিক কেন্দ্র, যেখানে পুরনো শহর, ছোট পাড়া ও প্রাগ দুর্গ অবস্থিত।

অর্থনীতি

প্রাগ চেক প্রজাতন্ত্রের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র এবং মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। দেশের মোট জিডিপির এক-চতুর্থাংশেরও বেশি এই শহরে উৎপন্ন হয় এবং এর মাথাপিছু আয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড়ের কাছাকাছি। শহরের অর্থনীতি মূলত সেবাখাতভিত্তিক, যার মধ্যে রয়েছে আর্থিক সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন, বাণিজ্য ও বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানির আঞ্চলিক সদর দপ্তর। বহু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তুলনামূলকভাবে কম খরচে দক্ষ শ্রমশক্তি ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে প্রাগে তাদের কার্যক্রম স্থাপন করেছে।

পর্যটন প্রাগের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। প্রতি বছর প্রায় এক কোটিরও বেশি পর্যটক শহরটি পরিদর্শন করেন, যা শহরের স্থায়ী বাসিন্দাদের সংখ্যার কয়েকগুণ। অতিরিক্ত পর্যটনের ফলে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলায় শহর কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করে আসছে। ঐতিহ্যবাহী শিল্পের মধ্যে প্রাগে বোহেমিয়ান কাচশিল্প ও বিয়ার উৎপাদনের সুনাম রয়েছে।

সংস্কৃতি ও স্থাপত্য

প্রাগ ইউরোপের অন্যতম সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধ শহর। শহরের স্থাপত্যে রোমানেস্ক, গথিক, রেনেসাঁস, বারোক, নব্যধ্রুপদী, আর্ট নুভো ও আধুনিক শৈলীর অনন্য সমাবেশ দেখা যায়। প্রাগ দুর্গ বিশ্বের বৃহত্তম প্রাচীন দুর্গ কমপ্লেক্সের একটি হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এর মধ্যে গথিক শৈলীর অনন্য নিদর্শন সেন্ট ভিটাস ক্যাথেড্রাল অবস্থিত। ১৩৫৭ সালে নির্মিত চার্লস সেতু, পুরনো শহরের চত্বর, ১৪১০ সালে নির্মিত বিশ্বের প্রাচীনতম কার্যকর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘড়ি, ইহুদি কোয়ার্টার জোসেফভ এবং আধুনিক স্থাপত্যের উদাহরণ হিসেবে ড্যান্সিং হাউস শহরের প্রধান আকর্ষণ।

প্রাগের সাহিত্য ও সঙ্গীতের ঐতিহ্যও বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। জার্মান ভাষার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক ফ্রাঞ্জ কাফকা এই শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং তার রচনায় প্রাগের প্রভাব সুস্পষ্ট। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক মিলান কুন্দেরা এবং "রোবট" শব্দের জনক লেখক কারেল চাপেকও এই শহরের সঙ্গে যুক্ত। সঙ্গীতজগতে সুরকার বেদ্রিখ স্মেতানা ও অ্যান্টোনিন দ্বোরাক চেক জাতীয় সঙ্গীত ঐতিহ্যের ভিত্তি রচনা করেন। প্রতি বসন্তকালে অনুষ্ঠিত প্রাগ স্প্রিং আন্তর্জাতিক সঙ্গীত উৎসব ইউরোপের অন্যতম প্রাচীন শাস্ত্রীয় সঙ্গীত উৎসব। শহরে জাতীয় থিয়েটার, রাজকীয় অপেরা ঘর ও অসংখ্য জাদুঘর, যার মধ্যে জাতীয় জাদুঘর ও কাফকা জাদুঘর উল্লেখযোগ্য।

শিক্ষা ও বিজ্ঞান

প্রাগ মধ্য ইউরোপের শিক্ষা ও বিজ্ঞানচর্চার একটি প্রধান কেন্দ্র। ১৩৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চার্লস বিশ্ববিদ্যালয় মধ্য ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং এটি দীর্ঘকাল ধরে অঞ্চলটির শিক্ষা ও গবেষণার পথিকৃৎ। এছাড়া চেক টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি, অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়, চেক বিজ্ঞান একাডেমি সহ অসংখ্য উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই শহরে অবস্থিত। ঐতিহাসিকভাবে জ্যোতির্বিজ্ঞান ও অঙ্কশাস্ত্রে প্রাগের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম; ষোড়শ শতকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী টাইকো ব্রাহে ও জোহানেস কেপলার প্রাগে কাজ করেছেন এবং কেপলারের গ্রহচলন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলো এই শহরেই সম্পন্ন হয়।

পরিবহন

প্রাগ মধ্য ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন কেন্দ্র। ভাৎসলাভ হাভেল বিমানবন্দর চেক প্রজাতন্ত্রের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, যা ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যের সঙ্গে শহরটিকে সংযুক্ত করে। শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত, যার মধ্যে রয়েছে তিনটি লাইনবিশিষ্ট পাতাল রেল (মেট্রো), �

Comments (0)

U

No comments yet. Be the first to comment!

You May Be Interested In

Related Articles