lulupedia

কোরিয়া

5737 words·১৮/৯/২০২৬·বাংলা
2

কোরিয়া হলো পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত একটি ভৌগোলিক অঞ্চল ও সাংস্কৃতিক সত্তা, যা কোরীয় উপদ্বীপ এবং সংলগ্ন দ্বীপসমূহ নিয়ে গঠিত; এর উত্তর-পশ্চিমে চীন এবং পূর্বে জাপান অবস্থিত, যার থেকে এটি কোরিয়া প্রণালী ও জাপান সাগর (কোরিয়ায় যাকে "পূর্ব সাগর" বলা হয়) দ্বারা পৃথক। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে কোরিয়া দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে বিভক্ত: উত্তরে গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া (উত্তর কোরিয়া) এবং দক্ষিণে কোরিয়া প্রজাতন্ত্র (দক্ষিণ কোরিয়া), যেগুলোর মধ্যে প্রায় ৩৮তম সমান্তরাল বরাবর কোরীয় অসামরিকীকৃত অঞ্চল (DMZ) অবস্থিত। কোরিয়ার রয়েছে স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, ভাষা (কোরীয় ভাষা) এবং কয়েক সহস্রাব্য ধরে বিস্তৃত ইতিহাস; আধুনিক যুগে এটি বিশ্বের অন্যতম গতিশীল অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।

ভূগোল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ

কোরীয় উপদ্বীপ এশিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ১,১০০ কিলোমিটার (প্রায় ৬৮০ মাইল) দক্ষিণে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে বিস্তৃত, যার মোট আয়তন প্রায় ২,২০,০০০ বর্গকিলোমিটার। এটি পশ্চিমে হলুদ সাগর, দক্ষিণে পূর্ব চীন সাগর এবং পূর্বে জাপান সাগর (পূর্ব সাগর) দ্বারা পরিবেষ্টিত। উপদ্বীপটি মূলত পাহাড়ি অঞ্চল, যেখানে ভূমির প্রায় ৭০ শতাংশ পর্বতময়। তেবেক পর্বতমালা পূর্ব উপকূল ধরে বিস্তৃত, যা উপদ্বীপের ভূপ্রাকৃতিক মেরুদণ্ড গঠন করেছে; অন্যদিকে সর্বোচ্চ শৃঙ্গ পেকতু পর্বত (চাংবাই পর্বত), যা চীনের সঙ্গে উত্তর সীমান্তে অবস্থিত এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৭৪৪ মিটার উঁচু, কোরীয় সংস্কৃতি ও পুরাণে পবিত্র তাৎপর্য বহন করে।

প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে আমনোক (ইয়ালু) নদী ও তুমেন নদী, যা চীনের সঙ্গে উত্তর সীমানা নির্ধারণ করে, এবং সিউলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হান নদী, গুম নদী এবং দক্ষিণের নাকদং নদী। কোরিয়ার জলবায়ু নাতিশীতোষ্ণ, যাতে চারটি সুস্পষ্ট ঋতু বিদ্যমান; সাইবেরীয় বায়ুস্রোতের প্রভাবে শীতল ও শুষ্ক শীতকাল এবং পূর্ব এশীয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উষ্ণ ও আর্দ্র গ্রীষ্মকাল এর বৈশিষ্ট্য। উপদ্বীপের বনাঞ্চল, উপকূলীয় জলাভূমি ও জোয়ার-ভাটার সমতলভূমি উল্লেখযোগ্য জীববৈচিত্র্যকে সমর্থন করে; আশ্চর্যজনকভাবে DMZ নিজেই অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণী প্রজাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আশ্রয়ভূমিতে পরিণত হয়েছে।

প্রাচীন ইতিহাস ও প্রাচীন রাজ্যসমূহ

প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ ইঙ্গিত দেয় যে কোরীয় উপদ্বীপে মানব বসতি প্রস্তর যুগ থেকেই বিদ্যমান। কোরীয় ঐতিহ্য অনুসারে, প্রথম কোরীয় রাষ্ট্র গোজোসন খ্রিস্টপূর্ব ২৩৩৩ অব্দে কিংবদন্তি রাজা দানগুন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়, যাঁর পুরাণ আজও কোরীয় জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রীয় উপাদান। ঐতিহাসিকভাবে প্রামাণ্য গোজোসন অন্তত খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী পর্যন্ত টিকে ছিল, এরপর খ্রিস্টপূর্ব ১০৮ অব্দে হান রাজবংশের চীনের কাছে পরাজিত হয়; এরপর উত্তর উপদ্বীপে লেলাং সহ কয়েকটি কমান্ডারি প্রতিষ্ঠিত হয়।

পরবর্তী যুগটি, যা তিন রাজ্য যুগ (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫৭–৬৬৮ খ্রিস্টাব্দ) নামে পরিচিত, সে সময় উত্তরে গোগুরিয়ো, দক্ষিণ-পশ্চিমে বেকজে এবং দক্ষিণ-পূর্বে শিল্লা রাজ্য, এবং পাশাপাশি গয়া সংঘের উত্থান ঘটে। এই রাষ্ট্রগুলো উন্নত লৌহ-প্রক্রিয়াকরণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তোলে এবং বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে, যা চতুর্থ শতাব্দীতে চীন থেকে এসে একটি প্রধান সভ্যতাগত শক্তিতে পরিণত হয়। তিন রাজ্য শক্তিশালী চীনা রাজবংশগুলোর সঙ্গেও সংঘাতে লিপ্ত ছিল; উল্লেখযোগ্যভাবে, গোগুরিয়ো সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে সুই রাজবংশের বিশাল আক্রমণ সফলভাবে প্রতিহত করে। ৬৬৮ সালে শিল্লা, থাং চীনের মিত্রতায় তেদং নদীর দক্ষিণে উপদ্বীপের অধিকাংশ একীভূত করে একীকৃত শিল্লা যুগের (৬৬৮–৯৩৫) সূচনা করে; অন্যদিকে উত্তরে প্রাক্তন গোগুরিয়ো অঞ্চল বালহে রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়, যা গোগুরিয়োর শরণার্থী ও মোহে জনগোষ্ঠী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

মধ্যযুগীয় ও প্রাক-আধুনিক যুগ

৯১৮ সালে ওয়াং গন (রাজা তেজো) গোরিয়ো রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ৯৩৬ সালে উপদ্বীপ একীভূত করে। "কোরিয়া" নামটি "গোরিয়ো" থেকে উদ্ভূত। গোরিয়ো যুগে (৯১৮–১৩৯২) বৌদ্ধধর্মের সমৃদ্ধি ঘটে, ত্রিপিটক কোরিয়ানা নামক বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের কাঠখোদাই মুদ্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অর্জন সৃষ্টি হয়, এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ধাতব অবিচলিত অক্ষর (মুভেবল মেটাল টাইপ) উদ্ভাবিত হয়, যা গুটেনবার্গের প্রায় দুই শতাব্দী পূর্বের। গোরিয়ো বারবার আক্রমণের সম্মুখীন হয়, যার মধ্যে একাদশ শতাব্দীতে খিতানদের ধ্বংসাত্মক অভিযান এবং ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মঙ্গোল আক্রমণ উল্লেখযোগ্য; মঙ্গোল আক্রমণের ফলে প্রায় এক শতাব্দীর জন্য এটি মঙ্গোল ইউয়ান রাজবংশের করদ রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

১৩৯২ সালে সেনাপতি ই সং-গিয়ে গোরিয়োকে উৎখাত করে জোসন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯১০ সাল পর্যন্ত পাঁচ শতাব্দীরও অধিক সময় কোরিয়া শাসন করে। জোসন রাষ্ট্রদর্শন হিসেবে নব্য-কনফুসীয়বাদ গ্রহণ করে, যা কোরীয় সামাজিক কাঠামো, শিক্ষা, শাসনব্যবস্থা ও পারিবারিক জীবনকে গভীরভাবে রূপ দেয়। রাজবংশের অন্যতম বিখ্যাত অর্জন ছিল হানগুল—কোরীয় বর্ণমালা—যা মহান রাজা সেজং কর্তৃক ১৪৪৩–১৪৪৬ সালে সাধারণ মানুষের সাক্ষরতা বিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রবর্তিত হয়। জোসন যুগে বৃষ্টি মাপার যন্ত্র, জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও উন্নত সিরামিকশিল্পসহ উন্নত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিরও বিকাশ ঘটে। ষোড়শ শতাব্দীর শেষে ইমজিন যুদ্ধ (১৫৯২–১৫৯৮) সংঘটিত হয়—তয়োতোমি হিদেয়োশির নেতৃত্বে জাপানের এক ধ্বংসাত্মক আক্রমণ—যা কোরীয় বাহিনীর, বিশেষত অ্যাডমিরাল ই সুন-শিন ও তাঁর বিখ্যাত কচ্ছপ-জাহাজের এবং মিং চীনের সহায়তার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিহত হয়। সপ্তদশ শতাব্দীতে মাঞ্চুদের আক্রমণের পর চিং রাজবংশের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে জোসন তুলনামূলক বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি অনুসরণ করে এবং "নির্জন রাজ্য" (Hermit Kingdom) উপাধি অর্জন করে।

জাপানি দখল

উনিশ শতকের শেষভাগে পাশ্চাত্য শক্তি ও জাপানের চাপে কোরিয়ার বিচ্ছিন্নতা সমাপ্ত হয়। প্রথম সিনো-জাপানি যুদ্ধ (১৮৯৪–১৮৯৫) ও রুশ-জাপানি যুদ্ধ (১৯০৪–১৯০৫) এর পর জাপান অঞ্চলটিতে প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৮৯৭ সালে স্বাধীনতা দাবির অংশ হিসেবে কোরিয়াকে "কোরীয় সাম্রাজ্য" ঘোষণা করা হয়, কিন্তু ১৯১০ সালে জাপান আনুষ্ঠানিকভাবে কোরিয়াকে সংযুক্ত (annex) করে, যা ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত স্থায়ী উপনিবেশিক শাসনের সূচনা করে।

উপনিবেশিক যুগ চিহ্নিত ছিল কোরিয়াকে জাপানি সাম্রাজ্যে আত্তীকৃত করার প্রচেষ্টায়—কোরীয় ভাষা ও সংস্কৃতির দমন, জোরপূর্বক শ্রম সংগ্রহ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উপনিবেশিক নাগরিকদের সামরিক বাধ্যবাধকতা ও "কমফোর্ট উইমেন" নামে পরিচিত কোরীয় নারীদের পদ্ধতিগত যৌন দাসত্বের মাধ্যমে। কোরীয় প্রতিরোধ বহু রূপ ধারণ করে, যার মধ্যে সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিল ১৯১৯ সালের এক মার্চ আন্দোলন—উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এক দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ অভ্যুত্থান, যা নির্মমভাবে দমন করা হলেও কোরীয় জাতীয়তাবাদকে উদ্বুদ্ধ করে। কোরীয় স্বাধীনতা কর্মীরা বিদেশে অস্থায়ী সরকার গঠন করে, যার মধ্যে ১৯১৯ সালে শাংহাইয়ে প্রতিষ্ঠিত কোরিয়া প্রজাতন্ত্রের অস্থায়ী সরকার উল্লেখযোগ্য, এবং মাঞ্চুরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়।

বিভাজন, যুদ্ধ ও দুই কোরিয়া

১৯৪৫ সালের আগস্টে জাপানের আত্মসমর্পণ উপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটায়, কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে কোরিয়া ৩৮তম সমান্তরালে বিভক্ত হয়ে যায়—মিত্রশক্তিগুলোর সমঝোতা অনুসারে সোভিয়েত বাহিনী উত্তর এবং মার্কিন বাহিনী দক্ষিণ দখল করে। ক্রমবর্ধমান শীতল যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যে একীভূত স্বাধীন কোরিয়া প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং ১৯৪৮ সালে দুটি পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়: দক্ষিণে সিনমান রি-র নেতৃত্বে কোরিয়া প্রজাতন্ত্র এবং উত্তরে কিম ইল-সুং-এর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া।

১৯৫০ সালের জুনে উত্তর কোরীয় বাহিনী দক্ষিণ আক্রমণ করলে কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০–১৯৫৩) শুরু হয়। এ

Comments (0)

U

No comments yet. Be the first to comment!

You May Be Interested In

Related Articles