lulupedia

বক্সিং

6112 words·১৩/৯/২০২৬·বাংলা
3

বক্সিং বা মুষ্টিযুদ্ধ একটি সংঘর্ষমূলক ক্রীড়া, যেখানে দুইজন প্রতিযোগী সাধারণত সুরক্ষামূলক গ্লাভস পরে দড়ি দ্বারা ঘেরা বর্গাকার মঞ্চে—যাকে "রিং" বলা হয়—পূর্বনির্ধারিত সময় ধরে একে অপরের দিকে ঘুষি মারে। এর লক্ষ্য হলো নিয়মসম্মত ও পরিষ্কার আঘাতের মাধ্যমে পয়েন্ট সংগ্রহ করা অথবা নকআউট (KO) বা টেকনিক্যাল নকআউট (TKO)-এর মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা। পেশাদার ও অপেশাদার—উভয় রূপেই পরিচিত এই ক্রীড়া মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন ও সর্বাধিক স্বীকৃত ক্রীড়াশৈলী, যা শারীরিক শক্তি, গতি, সহনশীলতা, কারিগরি দক্ষতা ও কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে গড়া। প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া হিসেবের পাশাপাশি বক্সিং একটি ফিটনেস-কার্যকলাপ এবং বহু সমাজে গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যবিশিষ্ট একটি মার্শাল ঐতিহ্য হিসেবেও টিকে আছে।

ইতিহাস

প্রাচীন উৎপত্তি

মুষ্টিযুদ্ধের প্রমাণ সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীন স্তরেই মেলে। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের সুমেরীয় অবতল ভাস্কর্যে এবং আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দের মিশরীয় সমাধিসৌধে বক্সারদের চিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। প্রাচীন গ্রিসে ক্রীড়াটি সুসংগঠিত রূপ লাভ করে; সেখানে খ্রিস্টপূর্ব ৬৮৮ অব্দে বক্সিং অলিম্পিক গেমসে অন্তর্ভুক্ত হয়। গ্রিক ক্রীড়াবিদরা গ্লাভস ছাড়াই লড়াই করতেন; বদলে হাতে চামড়ার ফিতা মুড়িতেন, যাকে বলা হতো "হিমান্তেস" (himantes)। রোমানরা এই ক্রীড়াকে গ্রহণ করে আরও নির্মম রূপ দেয় এবং ধাতু বা চামড়ার কাঁটা দিয়ে শক্তিশালী "কেস্টাস" (caestus) নামের গ্লাভস বিকশিত করে। তবে রোমান প্রতিযোগিতার হিংস্র চরিত্র পরবর্তী প্রাচীন যুগে ক্রীড়াটির সুনাম ক্ষুণ্ন করে। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ইউরোপে শতাব্দীর পর শতাব্দী সংগঠিত মুষ্টিযুদ্ধ মূলত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

আধুনিক পুনরুত্থান

আধুনিক ক্রীড়ার ধারাবাহিকতার সূত্রধর সতেরো-আঠারো শতকের ইংল্যান্ড, যেখানে "প্রাইজফাইটিং" বা পুরস্কার-যুদ্ধ জনপ্রিয় জনসমারোহের বিষয় হয়ে ওঠে। ১৭১৯ সালে ইংল্যান্ডের প্রথম বক্সিং চ্যাম্পিয়ন মর্যাদা লাভকারী জেমস ফিগ এই ক্রীড়াকে জনপ্রিয় করতে ভূমিকা রাখেন। অন্যদিকে ১৭৩০-এর দশকের চ্যাম্পিয়ন জ্যাক ব্রটন ১৭৪৩ সালে "ব্রটনস রুলস" নামে একটি নিয়মাবলি প্রবর্তন করেন। এই বিধিতে পতিত প্রতিপক্ষকে আঘাত করা এবং কোমরের নিচে ধরাকড়া নিষিদ্ধ করা হয়; এছাড়া ব্রটন প্রশিক্ষণে ব্যবহারের জন্য "মাফলার" নামে প্যাডেড গ্লাভসের প্রাথমিক রূপ চালু করেন। পরবর্তীতে ১৮৩৮ সালের "লন্ডন প্রাইজ রিং রুলস" (১৮৫৩ সালে সংশোধিত) ক্রীড়াটিকে আরও সুনিয়ন্দ্রিত করে; এতে ২৪ ফুট রিং এবং "নকডাউন" হওয়া ক্রীড়াবিদের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়।

মার্কেস অব কুইন্সবেরি নিয়মাবলি

নির্ণায়ক রূপান্তর আসে মার্কেস অব কুইন্সবেরি নিয়মাবলির মাধ্যমে, যা ১৮৬৭ সালে নবম মার্কেস অব কুইন্সবেরি জন ডগলাসের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রকাশিত হয় এবং যার মূল খসড়া প্রণয়ন করেন জন গ্রাহাম চেম্বার্স। এই নিয়মে প্যাডেড গ্লাভস ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়, কুস্তির ধরাকড়া বাতিল করা হয়, এক মিনিট বিরতিসহ তিন মিনিটের রাউন্ড প্রথা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং নকডাউনের ক্ষেত্রে দশ সেকেন্ডের গণনা চালু করা হয়। ১৮৮৯ সালে জন এল. সুলিভান ও জেক কিলরেইনের মধ্যকার শেষ খালি-হাতের হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়নশিপ প্রাইজ-রিং যুগের প্রতীকী সমাপ্তি নির্দেশ করে। কুইন্সবেরি নিয়মে ১৮৯২ সালে জেমস করবেটের কাছে সুলিভানের পরাজয় গ্লাভস-পরিহিত আধুনিক রূপের আধিপত্য চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করে।

নিয়ম ও প্রতিযোগিতার বিন্যাস

আধুনিক বক্সিং ম্যাচ রাউন্ডে বিভক্ত; পেশাদার প্রতিযোগিতায় প্রতিটি রাউন্ড সাধারণত তিন মিনিট এবং অধিকাংশ অপেশাদার প্রতিযোগিতায় দুই মিনিট দীর্ঘ হয়, রাউন্ডের মাঝে এক মিনিটের বিরতি থাকে। রাউন্ডের সংখ্যা ভিন্ন হয়: পেশাদার চ্যাম্পিয়নশিপ লড়াই সাধারণত বারো রাউন্ডের হয়, আর কম গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চার, ছয়, আট বা দশ রাউন্ডে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। অপেশাদার লড়াই সাধারণত তিন রাউন্ডের হয়।

বিজয় অর্জিত হতে পারে বিভিন্ন উপায়ে:

  • নকআউট (KO): একজন বক্সার নকডাউন হয় এবং রেফারির দশ পর্যন্ত গণনা শেষ হওয়ার আগে উঠতে ব্যর্থ হয়।
  • টেকনিক্যাল নকআউট (TKO): একজন প্রতিযোগী নিরাপদে লড়াই চালিয়ে যেতে অক্ষম বলে বিবেচিত হলে রেফারি, রিং-চিকিৎসক বা ক্রীড়াবিদের কোণার সহকারীরা লড়াই বন্ধ করে দেন।
  • ডিসিশন বা সিদ্ধান্ত: লড়াই নির্ধারিত রাউন্ড পূর্ণ করলে বিচারকদের স্কোরকার্ডের ভিত্তিতে বিজয়ী নির্ধারিত হয়—এটি হতে পারে সর্বসম্মত, বিভক্ত বা সংখ্যাগরিষ্ঠ সিদ্ধান্ত।
  • অপসারণ বা ড্র: বারবার নিয়মভঙ্গের কারণে একজন বক্সারকে অপসারণ করা যেতে পারে, অথবা লড়াই ড্র হয়ে শেষ হতে পারে।

নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে কোমরের নিচে আঘাত, মাথার পেছনভাগ বা ঘাড়ে ঘুষি, কিডনিতে আঘাত, মাথা ঠেসে ধাক্কা, ধরে রেখে ঘুষি মারা এবং পতিত প্রতিপক্ষকে আঘাত করা। নিয়মভঙ্গের ফলে সতর্কবার্তা, পয়েন্ট কর্তন বা অপসারণ হতে পারে। পেশাদার লড়াই মূল্যায়ন করেন সাধারণত তিনজন কর্মকর্তা, যাঁরা "টেন-পয়েন্ট মাস্ট সিস্টেম"-এ রাউন্ডের বিজয়ীকে দশ পয়েন্ট এবং পরাজিতকে নয় বা তার কম পয়েন্ট প্রদান করেন।

কৌশল ও ধরন

ঘুষি

চারটি মৌলিক ঘুষি বক্সিং কৌশলের মূল ভিত্তি গঠন করে:

  1. জ্যাব: সামনের হাতে মারা দ্রুত সোজা ঘুষি; দূরত্ব নির্ণয়, প্রতিপক্ষের ছন্দ ভাঙা এবং ধারাবাহিক আক্রমণের সূচনা করতে এর ব্যবহার হয়।
  2. ক্রস: পেছনের হাতে মারা শক্তিশালী সোজা ঘুষি; শক্তি সঞ্চারের জন্য সাধারণত কোমর ও পেছনের পা ঘোরানো হয়।
  3. হুক: কাছ থেকে বা মধ্য-দূরত্বে যেকোনো হাতে মারা অর্ধবৃত্তাকার ঘুষি, যার লক্ষ্য প্রতিপক্ষের মাথা বা শরীরের পাশ।
  4. আপারকাট: যেকোনো হাতে নিচ থেকে ঊর্ধ্বমুখে মারা ঘুষি, যা কাছ থেকে প্রতিপক্ষের থুতনি বা ধড় লক্ষ্য করে মারা হয়।

এই ঘুষিগুলোকে পরপর সাজিয়ে গঠিত ক্রমকে "কম্বিনেশন" বলা হয়। শরীরের দিকে মারা ঘুষি প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করে ফেলার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

প্রতিরক্ষা ও পায়ের কাজ

প্রতিরক্ষা কৌশল বক্সিংয়ে আক্রমণের মতোই কেন্দ্রীয় তাৎপর্য বহন করে। প্রচলিত প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের মধ্যে রয়েছে ব্লকিং (আড়াল), প্যারি (আসন্ন ঘুষি ফেরানো), স্লিপিং (মাথা ও শরীর ঘুরিয়ে ঘুষি এড়িয়ে যাওয়া), ডাকিং (নিচু হয়ে ঘুষির নিচ দিয়ে যাওয়া) এবং কভারিং আপ। পায়ের কাজ—দূরত্বের ভেতরে-বাইরে চলাফেরা, পিভট ঘোরা ও বৃত্তাকার গতি—বক্সারকে দূরত্ব ও কোণ নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয়। "অর্থোডক্স" বক্সাররা বাম হাত সামনে রেখে বাম পা এগিয়ে দাঁড়ান, আর "সাউথপ" বক্সাররা তার বিপরীত ভঙ্গি গ্রহণ করেন, যা প্রায়শই প্রতিপক্ষের জন্য কৌশলগত জটিলতা সৃষ্টি করে।

সরঞ্জামাদি

বক্সাররা প্যাডেড গ্লাভস পরেন, যার ওজন প্রশিক্ষণ ও অপেশাদার প্রতিযোগিতায় ১৬ আউন্স (প্রায় ৪৫৪ গ্রাম) এবং পেশাদার লড়াইয়ে সাধারণত ৮ থেকে ১০ আউন্স হয়। অন্যান্য সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে কবজি ও আঙুলের সন্ধি সমর্থনকারী হ্যান্ড র‍্যাপ, দাঁত রক্ষা ও মাথায় আঘাতের ঝুঁকি হ্রাসে মাউথগার্ড, গ্রয়েন প্রোটেক্টর এবং নরম-তলার বক্সিং বুট। অপেশাদার প্রতিযোগিতায় হেডগিয়ার বাধ্যতামূলক ছিল, তবে আন্তর্জাতিক বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন (IBA) ২০১৩ সালে শীর্ষ স্তরের পুরুষদের অপেশাদার লড়াই থেকে তা বাতিল করে; পেশাদার ম্যাচে কখনোই হেডগিয়ার ব্যবহৃত হয় না। রিং হলো চার কোণের খুঁটিতে চার স্তর দড়ি বাঁধা উঁচু বর্গাকার মঞ্চ, যার কোণগুলোতে প্যাডযুক্ত টার্নবাকল থাকে।

ওজন শ্রেণিবিভাগ

প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বক্সাররা নির্দিষ্ট ওজন বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। পেশাদার বক্সিংয়ে স্বীকৃত সতেরোটি ওজন শ্রেণি রয়েছে, যা মিনিমামওয়েট (১০৫ পাউন্ড/৪৭.৬ কেজি) থেকে শুরু করে হেভিওয়েট পর্যন্ত বিস্তৃত; পেশাদার স্তরে হেভিওয়েটের কোনো সর্বোচ্চ সীমা নেই। চারটি প্রধান স্বীকৃতিদানকারী সংস্থা—ওয়ার্ল্ড বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন (WBA), ওয়ার্ল্ড বক্সিং কাউন্সিল (WBC), ইন্টারন্যাশনাল বক্সিং ফেডারেশন (IBF) এবং ওয়ার্ল্ড বক্সিং অর্গানাইজেশন (WBO)—প্রতিটি বিভাগে নিজস্ব বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রক্ষণাবেক্ষণ করে। একাধিক ওজন বিভাগে লড়া খুবই প্রচলিত, এবং একাধিক বিভাগে বিশ্বখেতব অর্জনকারী বক্সাররা "মাল্টি-ডিভিশন চ্যাম্পিয়ন" হিসেবে বিশেষ সম্মান পান।

অপেশাদার ও পেশাদার বক্সিং

অপেশাদার বক্সিং আন্তর্জাতিকভাবে ওয়ার্ল্ড বক্সিং (২০২৩ সালে IBA-র স্থলাভিষিক্ত সংস্থা) এবং জাতীয়ভাবে সংশ্লিষ্ট ফেডারেশনের দ্বারা পরিচালিত হয়; এতে নিরাপত্তা ও কারিগরি স্কোরি�

Comments (0)

U

No comments yet. Be the first to comment!

You May Be Interested In

Related Articles